
বিশেষ প্রতিনিধি
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের কারসাজিতে সারাদেশে সৃষ্টি হয়েছে সারের মহা সংকট। দেশের কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার সংকট নিরসন না হলে বোরো-রবি মৌসুমে উৎপাদন কমে যাবে দেশের খাদ্য শস্য উৎপাদন। যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর।
সম্প্রতি কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় সফরে গিয়ে বলেছেন, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের কোন সংকট নেই। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ফেঁসে উঠেছে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নাটোর, নওগাঁ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ সারা দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা। তারা বলেছেন, যে মুহুর্তে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সংকটে ভুগছে সারাদেশের প্রান্তিক কৃষকেরা ঠিক সেই মুহুর্তে তার এই বক্তব্য হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজশাহী জেলার বাঘা থানার কৃষক আবদুর রাজ্জাক কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, স্যার আপনি আবার রাজশাহীতে আসেন কোথায় কোথায় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাওয়া যায় আমাদেরকে একটু দেখিয়ে দিন। আমরা সার টাকা দিয়ে কিনতে চাই। আমরা কোথাও সার খুঁজে পাচ্ছিনা। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক আবদুর রশিদ কৃষি সচিব কে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নিয়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সাথে সার নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। সার নিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের কে মিথ্যা আশ্বাস দিবেন না এবং কোন প্রকার প্রতারনার আশ্রয় নিবেন না।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধূরইল বাজার এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন অভিযোগ বলেন, কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান নিজেই একজন ফ্যাসিস আওয়ামী সরকারের একজন দোসর। অন্তর্বতী সরকারকে বিপাকে ফেলতে এবং ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করতে সুকৌশলে বিগত ফ্যাসিস আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান নিজেই। এক সময়ে ছাত্রলীগ নেতা কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ছিলেন বিগত ফ্যাসিস আওয়ামী সরকারের অন্যতম সহযোগী এবং মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য। কৃষি সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সুকৌশলে দেশে সারের সংকট তৈরি করেছে। সারাদেশের কোথাও বিএডিসি এবং বিসিআইসি’র গুদামে নেই কোন সার। সারের এই অবস্থা চলমান থাকলে চলতি বোরো-রবি মৌসুমে দেশে চরম সারের সংকট দেখা দিয়েছে। টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নিয়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য নিয়ে খেলাধুলা করছেন। আপনি কৃষি উপদেষ্টাকে সার নিয়ে মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে আপনি আপনার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। প্রান্তিক কৃষকেরা যদি সারের জন্য ফেঁসে উঠে তাহলে সেটা সামাল দেয়া হবে সরকারের জন্য অনেক কষ্টকর।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কৃষক আল আমিন বলেন, ডিলারের কাছে কার্ড দেখালে বিঘাপ্রতি মাত্র ৬ কেজি করে সার দিচ্ছে। আমার ছয় বিঘা জমির জন্য ১৮০ কেজি সার দরকার। কিন্তু মাত্র ৩৬ কেজি পেয়েছি। তাই বাধ্য হয়ে বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে গিয়েও বাজারে কোন সার পাচ্ছিনা।
রংপুর সদর উপজেলার চন্দন পার্টি ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের কৃষক মোঃ খায়রুজ্জামান বলেন, বোরো- রবি ফসলের আবাদের মৌসুম চলছে। কৃষক গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। তবে পর্যাপ্ত সার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বীজতলা থেকে জমিতে রোপণের ৬-৭ দিনের মাথায় নন-ইউরিয়া সার দিতে হয়। সামান্য কিছু ইউরিয়া সার অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করেছি। তবে কোথাও টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাওয়া যাচ্ছেনা।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের এমএস এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছি। আমার ডিলারশিপ এলাকায় ১০ হাজারের মতো কৃষক। এ মাসে ডিএপি ১৮৬ বস্তা, টিএসপি ১২০, এমওপি ১৩৮ ও ইউরিয়া বরাদ্দ পেয়েছি ১ হাজার ৪৮০ বস্তা। আমরা যে পরিমাণ বরাদ্দ পাই তার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি চাহিদা রয়েছে। বিএডিসি প্রতি মাসে আমাদের কে হিসাব করে যে সার প্রদান করে সেই সার উত্তোলন করে মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে পুনরায় সারের সংকট সৃষ্টি হয়। চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ না পাওয়ায় কোথাও কোথাও সার বেশী মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। এছাড়া সরকার বৈজ্ঞানিক হিসাবে বরাদ্দ প্রদান করে। কৃষকরা তো এসব মেনে সার দেন না। তারা সরকারি হিসাবের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সার প্রয়োগ করেন। এখানে ইউরিয়া বাদে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের সংকট রয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. উম্মে ছালমা বলেন, আমরা কঠোর মনিটরিং করছি। প্রত্যেক দোকানে মূল্যতালিকা ও রসিদ বই চেক করছি। কৃষক পর্যায়েও খোঁজ নিচ্ছি। কয়েক বছর ধরে কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি।
সার সংকটের অভিযোগ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ধান চাষের জন্য মূল উপাদান সার। আমন মৌসুমের আবহাওয়া সবসময়ই অনিশ্চিত থাকে। কখনো অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হয়, আবার অনাবৃষ্টিতেও ক্ষতি হয়। সেজন্য কখনো কখনো সেচের প্রয়োজন পড়ে। এর পরও আমাদের উৎপাদিত ধানের ৪০-৪৫ শতাংশ আমন থেকে আসে। সেজন্য বোরো- রবি মৌসুমে সার সংকট মোটেও ভালো সংবাদ নয়। সারের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়লে ধান উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, বন্যার কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমন উৎপাদন কম হয়েছে, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির ৫১ শতাংশই চালের কারণে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি সারের অপ্রতুলতা দেখা দেওয়ায় এবার বোরো- রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদন কমে যাবে। এছাড়া এমনটি হলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গেলে ডলার বা রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। অর্থাৎ সার সংকট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু খাদ্যে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই পড়বে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত উদ্যান বিশেষজ্ঞ খোন্দকার মেসবাহুল ইসলাম বলেন, ধান আবাদের জমি তৈরির শেষ চাষের সময় নন-ইউরিয়া যেমন টিএসপি, এমওপি, ডিএপি, জিপসাম ও জিংক জমিতে ছিটাতে হয়। এসব সার নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে জমিতে দিতে না পারলে ফলন কম হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়তে পারে। এমনকি ধানে চিটা বেশি হতে পারে।
এ সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে মোবাইলে কল করা হলে তিনি ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :