Agaminews
Dr. Neem Hakim

নিকলীতে অবৈধ ইটভাটায় বিপন্ন পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যময়


Ekattor News প্রকাশের সময় : জুন ২৫, ২০২৫, ১১:০৬ অপরাহ্ন /
নিকলীতে অবৈধ ইটভাটায় বিপন্ন পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা রহস্যময়

হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ইটভাটা মালিকরা অনিয়মকে যেন নিয়মে পরিণত করে নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই নিয়মবহির্ভূতভাবে চলে এখানকার বেশ কয়টি ইটভাটা। উপজেলার পশ্চিম কুর্শা গ্রামের একটি পরিবার যুগে যুগে রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করে চালাচ্ছে এসব ইটভাটা। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় আসে, তখনি ওই পরিবারের লোকেরা সেই দলের হয়ে যায়। এই পরিবারের লোকদের ঘিরে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও দীর্ঘদিনের। স্বার্থের জন্যে তারা অবলম্বন করে সব ধরনের কৌশলও।
নিকলী সদর ইউনিয়নের কুর্শা গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং একাধিক হাট ও বাজার সংলগ্ন দু’টো ইটভাটাতেই বৎসরের পর বৎসর পোড়ানো হচ্ছে ইট। ভাটা দুইটির নাম মেসার্স কামাল ব্রিকস ও আলতাফ ব্রিকস। এছাড়াও একই মালিকানাধীন যৌথ পরিচালনায় রয়েছে মেসার্স সামিহা ব্রিক ও শাপলা ব্রিক ফিল্ড। সামিহা ব্রিক ফিল্ডটি অবস্থিত জারইতলা ইউনিয়নের বনমালীপুর এলাকার গ্রামের পাশে মূল রাস্তা ঘেঁষে। যেটি তিন ফসলি জমির উপর নির্মিত। অপরটি পার্শ্ববর্তী কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের কান্দালিয়ায় রাস্তার পাশে দুই ফসলি জমির উপর।
মেসার্স কামাল ব্রিক ফিল্ড ও সামিহা ব্রিক ফিল্ডের মালিকের মধ্যে ইমরুল হাসান হলেন নিকলী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। মেসার্স আলতাফ ব্রিক ফিল্ডের যৌথ মালিকানাদের মধ্যে থানা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হাজী মোঃ রূপালী মিয়া। আর জামায়াতের নেপথ্যে থাকা ডোনার বলে পরিচিত অস্ট্রিয়া বসবাসকারী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আবুল হাসেম। এছাড়াও শাপলা ব্রিক ফিল্ডের মালিক সমালোচিত থানা বিএনপি নেতা ইদ্রিস আলী ওরফে ইদু মিয়া।
সরকারি তালিকায় এসব ভাটার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। পরিবেশ ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসক কর্তৃক লাইসেন্স ও অগ্নি সংযোগের অনুমোদন কোনটাই নেই। তবুও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই আদালতে রিটের দোহাই দিয়ে ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছে। ইটভাটা স্থাপন নীতিমালা অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনবসতি, কৃষিজমি, বন, নদী ও রাস্তার সংলগ্ন এলাকায় আইনিভাবে নিষিদ্ধ। অথচ এগুলো গড়ে উঠেছে এসবকিছুর পাশেই। যার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে পরিবেশ। দিবানিশি নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। দিনের পর দিন এই সব ইটভাটা চললেও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয়রা। দফায় দফায় এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে প্রতিকার না পেয়ে হতাশ ভোক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, দুই যুগের কাছাকাছি সময়ের ব্যবধানে কুর্শা গ্রামের একটি পরিবার আজ অগাধ টাকার মালিক। এ সবের উৎস নিয়েও রয়েছে নানান গুঞ্জন ও সমালোচনা। ইঞ্জিনিয়ার আবুল হাসিম প্রায় দুই যুগ আগে ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়াতে যান পড়াশোনার ভিসায়। এছাড়াও তার ভাইদের বেশ কয়েকজন ছেলেকে নিজে সেখানে নিয়ে কাজে লাগান। এমনকি নিজের ছেলে সন্তান বানিয়েও সেখানে নিয়ে যান। মুলত পরিবারটির উত্থান শুরু হাসিমের মাধ্যমেই। শুরু হয় যৌথ মালিকানায় একাধিক ব্যবসা। সর্বশেষ যৌথ পরিচালনায় সংযোজন ইটভাটার। যার সবক’টিই অবৈধ। এসব ইটভাটায় বিপন্ন আশেপাশের পরিবেশ। এলাকাবাসী ভোগান্তির শিকার হলেও তাদের কৌশলিক কায়দার কাছে প্রতিকার না পেয়ে হতাশ স্থানীয়রা।
রোদার পুড্ডা বাজারের ব্যবসায়ী মো. সেলিমসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অসংখ্য এলাকাবাসী জানায়, এই ইটভাটা মালিকরা এতটাই প্রভাবশালী, যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করার ক্ষমতা নেই স্থানীয়দের। এছাড়া প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যময়। ইটভাটার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের অধিকাংশই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই পরিবারের লোকেরা রাজনৈতিক পালাবদলে কখনো জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিতে মিশে অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকে।
ইটভাটা-সংলগ্ন ইবনে তাহমিনা মাদ্রাসার কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মাদ্রাসার ঠিক পাশেই ইটভাট! এর কালো ধোঁয়া আর ধুলা ক্লাসের ভেতরে ঢুকে যায়। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। রাতে ঘুমেও ডিস্টার্ব হয়। এছাড়াও ইবনে তাহমিনার ইয়াসিনসহ একাধিক শিক্ষক জানান, ইটভাটাগুলো বন্ধ হলে তারা সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারবে। শ্বাসকষ্টজনীত রোগবালাইসহ শব্দদূষণ থেকেও মুক্তি পাবে।
জারইতলা কমিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য কর্মী আব্দুস সোবহান বলেন, অবৈধ এসব ইটভাটা যেমন শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে, ঠিক তেমনি জমির টপ সয়েলও গিলে খাচ্ছে।
নিকলী উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি ইটভাটার বৈধতার বিষয়ে কথা হলে তিনি জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলার পরামর্শ প্রদান করেন।
কিশোরগঞ্জ জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মমিন ভূঁইয়া মুঠোফোনে জানান, নিকলীর সবকটি ইটভাটা অবৈধ। এছাড়াও কিছুদিন আগে মেসার্স আলতাফ ব্রিক ফিল্ডকে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পুনরায় কিভাবে তারা স্থাপন করল, এমন প্রশ্নে বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান। পাশাপাশি সামিহা ব্রিকসহ বাকীদের বিষয়েও রিট পরবর্তী অভিযান চলবে বলে ইঙ্গিত করেন।
জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খানের সাথে নিকলীর ইটভাটার বৈধতার প্রশ্নে কথা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন জানিয়ে তথ্যের দায়িত্বে থাকাদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ প্রদান করেন।