
আক্কাস আলী মিজান ও পলাশ চদ্র দাস
২০২৪ সালের জুলাই- আগস্ট মাসের গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এক নতুন বার্তা নিয়ে আসে। এই আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন দৈনিক বিজনেস ফাইল সাংবাদিক খান মুহম্মদ জুসফিকুর রহমান। তার সাহসী লেখনী তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রতিবেদনটি তার সেই অবদান এবং পরবর্তীতে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত।
সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত গঠন:
জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে, যখন মূলধারার অনেক গণমাধ্যম সরকারের নীরব ছিল, তখন খান মুহম্মদ জুসফিকের অন লাইন পোটাল ডব্লিউএসএন-২৪, দৈনিক বিজনেস ফাইল ও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে আন্দোলনের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তার প্রতিবেদনগুলোতে উঠে আসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির চিত্র। তিনি শুধু ঘটনা বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হননি বরং তার সম্পাদকীয়গুলোতে ওঠে আসে সরকারের নানা চরিত্র।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের অন্যতম সাহসী ব্যক্তি হিসেবে বিপ্লবীদের দিকনির্দেশনা দিতেন।
জুসফিকের লেখার ভাষা ছিল সহজ কিন্তু গভীর। তিনি এমনভাবে তথ্য এবং যুক্তি তুলে ধরতেন যা সাধারণ মানুষকেও সহজে প্রভাবিত করত। তার লেখনী তৎকালীন সরকারের মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী পাল্টা-আওয়াজ হিসেবে কাজ করে। তিনি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেন। তার প্রতিটি লেখায় ফুটে উঠত মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
ক্ষুরধার লেখনীর প্রভাব ও সরকারের প্রতিক্রিয়া:
খান মুহম্মদ জুসফিকের নির্ভীক সাংবাদিকতা দ্রুতই সরকারের নজরে আসে। তার লেখনীর কারণে তৎকালীন সরকার কিছুটা হলেও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ঐ সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ব্যাপক সমালোচনা করা হয় বিজনেস ফাইলে। মহামান্য আদালতের দেয়া রায় তিনি আংশিক কার্যকর করেন। বাকি অংশ কার্যকর করার কথা বললে তিনি গুরুত্ব দেননি। একদিন বিজনেস ফাইল সম্পাদককে তিনি তার কার্যালয়ে আসতে নিষেধ করেন, বলেন আমি এ কাজ করব না আদালত আমি চালাই। বলাবাহুল্য আইন মন্ত্রী অনেক মিথ্যা কথা বলতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী মন্ত্রী হাসান মাহমুদ বিজনেস ফাইল ২০০৪ সালে ডিক্লিয়ারেশন পায় বলে পত্রিকাটি বিএনপি ঘরানার বলে মনে করতেন। প্রচার সংখ্যা বৃদ্ধির যোগ্যতা থাকলেও করতে দেননি তিনি। ঐ সময় অভি চৌধুরীর সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গ্রীনটিভি লি. কে তার (হাসান মাহমুদ) স্ত্রীর নামে লাইসেন্স করে নেন।
এদের পার্টনার করে রংধনু গ্রুপ ও সাবেক আইজিপি বেনাজীর আহমেদকে। সরকার বুঝতে পারছিল যে, বিজনেস ফাইল সম্পাদক,সাংবাদিক জুসফিক এদের লেখা জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করছে এবং আন্দোলনে শক্তি জোগাচ্ছে। তাদের থামানোর জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসতে থাকে। বিভিন্ন ধরনের হুমকি পর্যন্ত যন্ত্র দেয়া হয়।
গুম হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা:
জুলাই আন্দোলনের পূর্বে, যখন সরকার দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো, তখনই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা। এক রাতে, খান মুহম্মদ জুসফিকুর রহমান তার বাসা থেকে নিখোঁজ হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাদা পোশাকে কিছু লোক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের সদস্যরা এবং সহকর্মীরা অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ পাননি। সরকারের পক্ষ থেকে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে কোন এক ইশারায় খান মুহম্মদ জুসফিক ফিরে আসেন। কিন্তু তাকে মিথ্যা ভুয়া রাষ্ট্র দ্রোহী মামলায় ৮ মাস জেলে আটকে রাখা হয় কিন্তু তিনি ফিরে আসলেও তার মধ্যে যে ট্রমা কাজ করছে তা’ বর্ননাতীত। তার নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশের মুক্ত সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। গণমাধ্যমের একজন বলিষ্ঠ সাংবাদিক তিনি। তার গুম/নিখোঁজ হওয়া প্রমাণ করে তিনি একজন দেশ প্রেমিক সংবাদিক। সাংবাদিকের কলম কত শক্তিশালী হতে পারে? জুলাই আন্দোলনে তার অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা উচিত। তার ত্যাগ এবং সাহসী ইতিহাস চির অমলিন হয়ে থাকবে। তার এই ত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, যা তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস যোগাবে।
জুসফিক এত কিছুর পরেও
বলেন ৫২ এর মহান ভাষা আন্দোলন,৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ২৪ এর জুলাই শহীদদের চেতনায় গড়ে উঠুক প্রিয় বাংলাদেশ।
তার সোজাসাপটা বক্তব্য সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে একদিন বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবেই।
আপনার মতামত লিখুন :