
পলাশ দাশ, স্টাফ রিপোর্টার
শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মায়ের দুধের গুরুত্ব, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মায়ের দুধের বিকল্প দুগ্ধ ব্যবহারে আইন সম্পর্কে বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরাম গতকাল বেলা ১২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক মোঃ মাহবুবুল হক এবং মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশ নিউনেটাল ফোরাম (বিএনএফ)-এর মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ মোঃ মজিবুর রহমান।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক যায়যায়দিনের বিশেষ প্রতিনিধি এ কে এম সাখাওয়াত হোসেন, দৈনিক কালবেলা’র ডেপুটি এডিটর দীপংকর লাহিরী এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন অধ্যাপক সুফিয়া খাতুন, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম প্রমূখ।
তারা বলেন – আজ আমরা আপনাদের সামনে এমন একটি বিষয়ের অবতারণা করছি যা একজন নবজাতক ও শিশুর জীবন বাঁচানোর রক্ষাকবচ- আর তা হলো মায়ের বুকের দুধ যাহা পৃথিবীতে লিকুইড গোল্ড নামে পরিচিত। তারা সাংবাদিকদের অত্যন্ত বিনয়ের সহিত বলেন আপনারাই একমাত্র পারেন মায়ের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে। আপনারা হচ্ছেন সমাজের দর্পণ এবং জাতির বিবেক। আপনাদের মাধ্যমে সমাজের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই ফুটে ওঠে। আপনাদের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষের নিকট বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা ও এর বিকল্প দুধ অর্থাৎ কৌটার দুধ খাওয়ানোর ঝুঁকি, আইনের বিধান ও শাস্তি সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে দিতে আজকের এই মহতী আয়োজন।
তারা আরো বলেন-মায়ের দুধ কেবল একটি খাদ্য নয় বরং একটি জীবন্ত প্রতিষেধক, একটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির উৎস এবং শিশুর প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে “সুপার ফুড “ বলে উল্লেখ করেছেন – কারণ এতে এমন সব উপাদান রয়েছে, যা মানব শরীরের অন্য কোন খাদ্য বা পানীয় থেকে পাওয়া যায় না। মায়ের বুকের দুধ প্রকৃতির একটি অনন্য সৃষ্টি যার মধ্যে রয়েছে-সুষম পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধী উপাদান, হিউম্যান মিল্ক অলিগোস্যাকারাইডস, এনজাইম ও হরমোন যা একটি শিশুকে সব দিক থেকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। আর মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে কৌটার দুধ পান করালে শিশুর মধ্যে নানা রকমের বিপদ ও সীমাবদ্ধতা চলে আসে যার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুকি, মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত, জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা, অতি পুষ্টি বা অপুষ্টি, মাসিক খরচের বোঝা, মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে দেশে মাতৃদুগ্ধ না খাওয়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত সুরক্ষাও রয়েছে। কোন স্বাস্থ্য কর্মী (চিকিৎসক, নার্স বা মায়ের সেবায় নিয়োজিত কোন ব্যক্তি) অথবা কোম্পানির লোকজন, বুকের দুধের পরিবর্তে অন্য কোন দুধ খাওয়ানোর জন্য উপদেশ দেন বা উৎসাহিত করেন, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হবেন, লিফলেট বা প্রচার পত্র বিলি করলেও অপরাধ হবে এবং এই অপরাধে জামিন নেই ও অন্য কোন আইন এই বিচারে প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে তারা জানায়।
পরিশেষে বাংলাদেশ নিওনেটাল ফোরাম (বিএনএফ) এর মহাসচিব ও বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের প্রধান দায়িত্ব প্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ মজিবুর রহমান বলেন – ‘পথ নবজাতকেরা আপনজন, হবে না কোন বিভাগ’। মা হারা পরিত্যক্ত এসব নবজাতকরা মায়ের বুকের দুধ পাবে না এটা মেনে নেওয়া যায় না। এই শূন্যতা পূরণের জন্য ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। এখানে দাতাদের নিরাপদ ভাবে স্ক্রিনি করা হবে, দুধ সংগ্রহ, পাস্তুরাইজেশন ও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হবে — যা প্রয়োজনে এই সব অসহায় নবজাতকদের জীবন বাঁচাতে ব্যবহার করা যাবে। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের উদ্যোগ নবজাতকের মৃত্যুহার কমাতে অসামান্য সাফল্য এনেছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন-মায়ের বুকের দুধ শুধুমাত্র একটি খাদ্য নয়-এটি প্রতিটি শিশুর জন্মগত অধিকার। এটি শিশুর জীবন, বুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের গ্যারান্টি। এটি শুধু পুষ্টি নয় বরং রোগ প্রতিরোধী শক্তি যা মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতে সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দেয়।
অন্যদিকে, ফর্মুলা দুধ বা কৃত্রিম বিকল্পে নেই এন্টিবডি এবং বাড়িয়ে দেয় সংক্রমণ ও দীর্ঘ মেয়াদী রোগের ঝুঁকি যা একটি পরিবারকে অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক চাপে ফেলে দেয়। তাই তিনি আন্তরিকভাবে আহŸান জানায় — শিশুর জন্মের পর প্রথম ৬ মাস একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি কর্মস্থলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর ফর্মুলা দুধের অপ্রয়োজনীয় প্রচার ও অপব্যবহার বন্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে সবাইকে সজাগ করে তোলার জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানায়।
আপনার মতামত লিখুন :